মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯, ০৭:০৯ পূর্বাহ্ন

দলিল ও খতিয়ান টেম্পারিং : চক্রে সরকারি দলের নেতাও

চট্টগ্রাম : জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা দালাল চক্রে অতিষ্ঠ। ‍দলিল ও খতিয়ান টেম্পারিং করে চলছে অভিনব প্রতারণা।এই জালিয়াত চক্রে আছে আইনজীবী ও সরকারি দলের নেতাও। স্বদেশ টুয়েন্টিফোরের সিনিয়র প্রতিবেদক সরেজমিন গিয়ে জালিয়াত চক্রের প্রতারণার চিত্র এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন।

কেস স্টাডি-১
হাটহাজারীর মধ্যম পাহাড়তলী মৌজায় বিএস ১২৩৬ দাগে মোট জমির পরিমাণ ১৬ শতক। এ জমির মালিক হোসেন মো. মনসুর আলী। চট্টগ্রাম বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন এ জায়গা অধিগ্রহণ করে (এল এ কেইস ২৯/১৭-১৮)। যথারীতি ক্ষতিপূরণ পেতে ভুমি অধিগ্রহণ শাখায় আবেদন করেন মনসুর আলী। কর্মকর্তারা তাকে মূল দলিলের সার্টিফাইড কপি জমা দিতে বলেন। মনসুর দলিলটি জমা দিলেও কর্মকর্তারা দেখেন, জায়গার পরিমাণের জায়গায় সেটি টেম্পারিং করা। মনসুর ৮ গণ্ডাকে কৌশলে বানিয়েছেন ১১ গণ্ডা। পরে মূল দলিল চাইলে সেটিও জমা দেন মনসুর। এবার ভিন্ন কৌশল করেন মনসুর। দলিলটি যাতে পড়া না যায় সেজন্য তিনি কার্বন দিয়ে ঘষামাঝা করেন। মনসুরের জায়গার পরিমাণ বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেয়ার প্রতারণার কৌশলটি ধরে ফেলেন জেলা প্রশাসনের ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়ছার।

কেস স্টাডি-২
নগরের উত্তর কাট্টলী মৌজায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ লাইন নির্মাণ প্রকল্পের জন্য কিছু জমি অধিগ্রহণ করে সরকার (এল এ কেইস-২৩/১৭-১৮)। ওই মৌজার অধীন বিএস ৫৮৬৬ এবং ৫৮৪০ দাগে মোট জমির পরিমাণ ৩৮ শতক। এ দুটি দাগের আন্দর ৩৩ শতক জমির মালিক আবদুল ওয়াদুদ। কিন্তু এ জমি নিয়ে ২০১১ সালে সিনিয়র সহকারী জজ তৃতীয় আদালতে স্বত্ব ঘোষণার মামলা (৩৫/১১) করেন দোলন কুমার গুহ। আদালতে মামলা থাকায় এ জমির ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে অস্বীকার করে ভূমি অধিগ্রহণ শাখা কর্তৃপক্ষ। এক পর্যায়ে ২০১৮ সালের মে মাসে আরমান নামে এক দালাল বাদি দোলন কুমার গুহ মামলাটি প্রত্যাহার নিয়েছেন মর্মে একটি নকল ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় নিয়ে আসেন। কর্মকর্তারা মামলার বাদির হলফনামা চাইলে তা এনে দেন আরমান। যাচাই করে দেখা যায়, মামলা প্রত্যাহার সংক্রান্ত আদালতের ওই নকলে বাদির সই ও ছবি জাল করা হয়েছে।

ভুমি অধিগ্রহণ শাখা ঘিরে সংঘবদ্ধ দালাল চক্রের প্রতারণা শুধু এ দুটি নয়, এ চক্রের কেউ দলিল কিংবা খতিয়ান টেম্পারিং করে আবার কেউ জমির ক্ষতিপূরণের টাকা পাইয়ে দেয়ার নামে প্রকৃত জমির মালিকদের সর্বস্বান্ত করছে।

দালালদের এ চক্রে আছে এক শ্রেণির আইনজীবী, সরকারি দলের নেতাসহ বেশ কিছু টাউট। ভূমি অধিগ্রহণ কার্যালয় ঘিরে গড়ে ওঠা এ চক্রের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

দালালদের উৎপাতের বিষয়টি স্বীকার করে জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ শাখা ঘিরে সংঘবদ্ধ দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। তবে তাদের অপতৎপরতা বন্ধে বিভিন্ন সময় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।’

জেলা প্রশাসক জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের টাকা কখন ছাড় হবে সে সময়ের জন্য চক্রটি ওৎ পেতে থাকে। একটি এলএ কেইস (ভূমি অধিগ্রহণ মামলা) ম্যাচিউরড্ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট জমির মালিককে টাকা গ্রহণের জন্য ৮ ধারার নোটিস করা হয়। এসময় চক্রটি বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ৮ ধারার নোটিস জারির পর চক্রটি তথ্য নিয়ে জমির মালিকের খোঁজে মাঠে নামে। এরপর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্ষতিপূরণের টাকা হাতিয়ে নিতে নানা ফন্দি আাঁটে। তারা বলে, ‘আমরা আপনার জমির ক্ষতিপূরণের শতভাগ টাকা পাইয়ে দেব। বিনিময়ে কমিশন দিতে হবে। আবার কেউ কেউ ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিককে মামলার ফাঁদে আটকে দিয়েও ফায়দা লুটে।

ভুমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়ছার জানান, দালালদের সিন্ডিকেটে কিছু আইনজীবী, ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সার্ভেয়ার এবং টাউট জড়িত। তারা অবৈধভাবে ক্ষতিপূরণ পেতে জায়গার দলিল ও খতিয়ান টেম্পারিং করে মামলার সৃষ্টি করে। এরপর মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার নামে সংশ্লিষ্ট জমির মালিকের কাছে টাকা দাবি করে। কোনো কোনো জমির মালিক তাদের প্রতারণার শিকারও হচ্ছেন।

জানা গেছে, দালাল চক্রের ৭-৮জন সদস্যকে চিহ্নিত করেছে জেলা প্রশাসন। তারা হলেন-সরওয়ার, মোজাম্মেল, আরমান, ইকবাল, আশীষ, মিঠুন ও সুমন। এছাড়া ভুমি অধিগ্রহণ শাখার কিছু সার্ভেয়ারের সঙ্গে এ চক্রের যোগসাজশ রয়েছে। সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে দীপু ও জাহাঙ্গীর নামে দুজন সার্ভেয়ারকে শাস্তিমূলক অন্যত্র বদলি করেছে জেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ।

এক কর্মকর্তা জানান, দালালদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের উপর সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন সরকারি দলের মহানগর শাখার মাঝারি থেকে শুরু করে শীর্ষ পদে থাকা অনেক নেতা। এমন কি মন্ত্রী এমপিদের অনেক কাছের লোকজনও এ কাজে যুক্ত। তবে ঝামেলা এড়াতে সেসব লোকজনের নাম জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) আমরিুল কায়ছার জানান, সম্প্রতি আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নে ইকোনমিক জোন গড়ে তুলতে বেশ কিছু জমি অধিগ্রহণ করে জেলা প্রশাসন। সেখানকার বাসিন্দা আবদুস ছমদের নামে বিএস রেকর্ড চূড়ান্ত থাকায় তার ছেলে আহমদ নবী ১৬ শতক জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা দাবি করেন।

জেলা প্রশাসনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৭৭ এবং ১৯৮৩ সালে দুই দলিলে আবদুস ছমদ ওই জমি আপন বড়ভাই আবদুল বারিক ও আবু সৈয়দ নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন। ফলে এ দুই ব্যক্তির ওয়ারিশ ক্ষতিপূরণের টাকা প্রাপ্য হন। আহমেদ নবী ক্ষতিপূরণের টাকা চাওয়ার আইনগত অধিকার রাখেন না। কিন্তু সোহেল নামে এক দালাল যাকে আহমেদ নবী চেনেনও না, তিনি আহমদ নবীকে ক্ষতিপুরণের টাকা দিতে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে জেলা প্রশাসনে নিজেকে ‘ক্ষমতাধর’ ব্যক্তি হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেন। আহমদ নবীর নামে জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে এবং দুদকেও  দুর্নীতি ও অনিয়মের  অভিযোগ দেন।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, ‘সোহেল নামের ওই টাউটকে পেলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে দেব।’

স্বদেশ টুয়েন্টিফোর //এমআর /এবিএম 


পোস্ট টি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

স্পন্সরড নিউজ

সম্পাদক:
আসিফ সিরাজ

প্রকাশক:
এইচ এম শাহীন
চট্টগ্রাম অফিসঃ
এম বি কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৯০ হাই লেভেল রোড, ওয়াসা মোড়, চট্টগ্রাম।

যোগাযোগঃ
বার্তা কক্ষঃ ০১৮১৫৫২৩০২৫
মেইলঃ news.shodesh24@gmail.com
বিজ্ঞাপনঃ ০১৭২৪৯৮৮৩৯৯
মেইলঃ ads.shodesh24@gmail.com
কপিরাইট © ২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | স্বদেশ২৪.কম
সেল্ফটেক গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।