মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯, ০৬:৩৮ পূর্বাহ্ন

মোটরসাইকেল : ছোট যানে বড় ঝুঁকি!

ঢাকা: সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে কর্মস্থল গুলশানে যাচ্ছিলেন আসিফ শাওন। পথে বিজয় সরণি উড়োজাহাজ ক্রসিংয়ে একটি প্রাইভেট কারের ধাক্কায় ছিটকে পড়েন তিনি। পথচারীরা উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

কিছুদিন আগে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের ওপর মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইমন নামে এক কলেজছাত্রের মৃত্যু হয়। তার সঙ্গে থাকা দুই বন্ধু আরোহী গুরুতর আহত হন।

অন্যদিকে রাজধানীর বাইরে, নরসিংদীতে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে নিহত হন দুই তরুণ। মাদারীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজশাহী, নওগাঁ, ভোলা, বরিশাল, ঝিনাইদহ, বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতের খবর আসছে প্রায় প্রতিদিনই। গতকাল রবিবার (৭ জুলাই) রাতে মাদারীপুরের কালকিনিতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২জন নিহত হয়েছে।

সড়ক-মহাসড়কে, ব্যাপকহারে বাড়ছে মোটরসাইকেল। বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠছে যানটির চলাচল। পাশাপাশি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এতে বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ঈদে মহাসড়কে ও মফস্বলের সড়কগুলোতে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলের। এ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের। ফলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বাড়ছেই। তবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে ব্যক্তির সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবারের বলিষ্ঠ ভূমিকা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজধানী থেকে জেলা শহর, এমনকি গ্রামাঞ্চলেও মোটরসাইকেল চলাচল প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন। কিশোর বয়সিদের বেশি ঝোঁক বাইক চালনায়। এদের অধিকাংশই অদক্ষ এবং বেপরোয়া। যাদের অধিকাংশেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। মাথায় হেলমেট পড়তে চায় না।

দুজনের জায়গায় তিনজন কোথাও কোথাও চারজন চড়ে বেপরোয়া গতিতে চালায় বাইক। এসব ক্ষেত্রে অভিভাবকরাও থাকেন উদাসীন। পরিবারের লোকজনও বাধাও দেন না। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের মোটরসাইকেল কিনে দিয়ে আরো উৎসাহ জোগান।

জেলা বা গ্রামাঞ্চলের এসব ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশ বা থানা পুলিশের তেমন কোনো কঠোর পদক্ষেপও চোখে পড়ে না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশ দিয়ে বা আইন দিয়ে নয়, নিজে থেকেই সচেতন হলেই এসব দুর্ঘটনা রোধ করা সহজ। সেখানে পরিবারের ভূমিকায় বেশি জরুরি বলে মন্তব্য করেন তারা।

হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ডিআইজি আতিকুল ইসলাম বলেন, মোটরসাইকেল ছোট যান। কিন্তু ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে মহাসড়কে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দূরপাল্লার যানবাহনের সঙ্গে অনেকটা পাল্লা দিয়ে বা গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়েই দুর্ঘটনা ঘটছে। যাতে প্রাণহানিই বেশি ঘটছে। এমন ঝুঁকি সত্ত্বেও অনেকে দূরের পথেও চলছেন মোটরসাইকেলে। ঝুঁকি এড়াতে ব্যক্তিগত সচেতনতা বাড়াতে হবে। পরিবারকেও নিতে হবে বলিষ্ঠ ভূমিকা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এবারের ঈদে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিসংখ্যান প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত যা তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে, এবারও সড়ক ও মহাসড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি।

জানা গেছে, এবারে ঈদুল ফিতরের ছুটিসহ চার দিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৩ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে প্রায় ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঢাকায় বেশি :

ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিনই নামছে নতুন মোটরসাইকেল। তবে গত দুই বছরে এই হার বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। মূলত অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে রাজধানীতে বেড়েছে মোটরসাইকেলের সংখ্যা।

গণপরিবহন সংকটের এ শহরে মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং যাত্রীদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা। চালকের অদক্ষতা, আইন না মানা, দ্রুত যাওয়ার প্রবণতা, নিরাপত্তা উপকরণ না নিয়ে চালানো, রাজধানীর সড়ক সম্পর্কে ধারণা না থাকাকেও দুর্ঘটনার কারণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে ঢাকায় রাইড শেয়ারিং সেবা চালু হয়। গত তিন বছরে বেশ কয়েকটি কোম্পানি ব্যাপকভাবে রাইড শেয়ারিং ব্যবসা করছে। ২০১৬ সালে ঢাকায় ৫৩ হাজার ৭৩৮টি মোটরসাইকেলের নিবন্ধন হয়। ২০১৭ সালে নিবন্ধিত হয় ৭৫ হাজার ২৫১টি। ২০১৮ সালে তা লাখ ছাড়িয়েছে।

তবে রাইড শেয়ারিংয়ে যেসব মোটরসাইকেল চলে তার একটা বড় অংশ ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলার নম্বরপ্লেটধারী। এতে করে ঢাকায় চলা মোটরসাইকেলের প্রকৃত সংখ্যা জানাও সম্ভব নয়। ২০১৮ সালে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় নিহতদের অনেকেই রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলের চালক অথবা যাত্রী ছিলেন।

চালকের অদক্ষতা, নিরাপত্তা জ্ঞানের অভাব :

দুর্ঘটনার জন্য মোটরসাইকেল চালকদের অদক্ষতা এবং নিরাপত্তা জ্ঞানের অভাবকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন বুয়েটের এআরআইর সহযোগী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ।

তিনি বলেন, রাইড শেয়ারিংয়ে অদক্ষ চালক বেশি। তাদের কাছে ড্রাইভিং শিখে আসার বিষয়টা নেই। চালকদের অনেকেই বেপরোয়া, অনেকে দক্ষ হলেও নিরাপত্তা জ্ঞানের অভাব আছে। সবাই অপেশাদার। তারা হেলমেটও ব্যবহার করতে চান না। আবার যেসব হেলমেট পরেন তাও অনেক নিম্নমানের, পাতলা ধরনের। মামলা থেকে বাঁচতে নামমাত্র হেলমেট পরেন। এসব কারণেই মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনা বেড়েছে।

সাইফুন নেওয়াজ বলেন, মোটরসাইকেল খুব হালকা ও দুই চাকার ওপর চলা একটা ছোট বাহন। দুটি কার বা একটা কারের সঙ্গে রিকশার দুর্ঘটনা ঘটলেও যাত্রীদের মারা যাওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। ছোট যান কিন্তু মৃত্যুঝুঁকি বেশি।

আবার রাইড শেয়ারিংয়ের চালকদের দ্রুত ট্রিপ শেষ করার একটা ব্যাপার থাকে। এ জন্য তারা দ্রুত চালাতে চান। এ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। মাত্র এক ঘণ্টার প্রশিক্ষণেই মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং দেওয়া শুরু করেছেন, এমন চালকও রয়েছেন।

সম্প্রতি ঈদের ছুটিতে মাদারীপুরে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যান বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জাহিদ আকন। তিনি জানালেন, বাড়ি থেকে কালকিনিতে যাওয়ার সময় মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন তিনি। পেছন থেকে অন্য একটি বাইক তাকে সজোরে ধাক্কা দিলে তিনি ২০ ফুট দূরে ছিটকে পড়েন। এতে গুরুতর আহত হন তিনি।

কিন্তু দামি ও মজবুত হেলমেটের কারণে তিনি মাথায় বড় চোট থেকে বেঁচে যান। তবে তার হাত-পা ও শরীরের কিছু অংশ থেঁতলে যায়। জাহিদ মনে করেন, তার মজবুত হেলমেটই তাকে প্রাণে বাঁচিয়েছে। এ জন্য তিনি প্রত্যেক বাইক চালককে টেকসই ও মজবুত হেলমেট পরিধানের পরামর্শ দেন।

স্বদেশ টুয়েন্টিফোর//জেসি/আরএম


পোস্ট টি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

স্পন্সরড নিউজ

সম্পাদক:
আসিফ সিরাজ

প্রকাশক:
এইচ এম শাহীন
চট্টগ্রাম অফিসঃ
এম বি কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৯০ হাই লেভেল রোড, ওয়াসা মোড়, চট্টগ্রাম।

যোগাযোগঃ
বার্তা কক্ষঃ ০১৮১৫৫২৩০২৫
মেইলঃ news.shodesh24@gmail.com
বিজ্ঞাপনঃ ০১৭২৪৯৮৮৩৯৯
মেইলঃ ads.shodesh24@gmail.com
কপিরাইট © ২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | স্বদেশ২৪.কম
সেল্ফটেক গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।