সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:৩৪ পূর্বাহ্ন

রোহিঙ্গাদের এনআইডি: জয়নাল-ফারুকের বাসা যেন ইসির অফিস!

বিশেষ প্রতিনিধি : রোহিঙ্গাদের এনআইডি জালিয়াতির ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া জয়নাল কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন অফিসে কর্মরত জয়নালসহ আরও একটি পরিবারের সদস্যরা জড়িত বলে নিশ্চিত হয়েছে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। ওই দুই পরিবারের সদস্যরা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে বিভিন্ন পদে কর্মরত।

গতকাল ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে গ্রেফতার হওয়া মোস্তাফা ফারুকও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদশক রাজেশ বড়ুয়াকে চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে জয়নাল ও ফারুক রোহিঙ্গাদের এনআইডি বানিয়ে দেওয়ার চমকপ্রদ কাহিনী বলেছেন। তবে ঘটনার মূল নায়ক জয়নাল আবেদীন।

জয়নাল পুলিশ কর্মকর্তাদের জানায়, তার চক্রে নিবাচন কমিশনে কর্মরত পরিবারের সদস্য ছাড়াও দালাল আছে ৫-৬জন। এই চক্রের অন্যতম পাঁচলাইশ থানা নির্বাচন অফিসের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কর্মরত এক নারী।

ওই চক্রে জড়িত আছে তার এক খালাতো ভাই। তিনি কক্সবাজার সদর নির্বাচন অফিসে অফিস সহায়ক পদে কর্মরত আছেন। আরেক চাচাত ভাই বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাচন অফিসে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কর্মরত আছেন।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গতকাল গ্রেফতার হওয়া মোস্তাফা ফারুক ২০১৬ সালে কোতোয়ালী থানা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় হাবিব উল্লাহ সওদাগর নামে এক ব্যক্তি নগরের আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড থেকে ভোটার হওয়ার আবেদন করেছিলেন। ভুয়া জন্মনিবন্ধন সনদ দেয়ায় তৎকালীন কোতোয়ালী থানা নির্বাচন কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ শেখ তার আবেদন বাতিল করেন। কিন্তু মোস্তফা ফারুক নিবন্ধন ফরম নম্বর পরিবর্তন করে ওই ব্যক্তিকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন এবং ওই ব্যক্তি জাতীয় পরিচয়পত্রও সংগ্রহ করেন। পরে ওই বছরের ২৯ জুন এ প্রকল্পের উপ পরিচালক মো. ইলিয়াস ভূঁইয়া তাকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন।

দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ এর উপ সহকারী পরিচালক শরীফ জানান, গ্রেফতার হওয়া জয়নাল ও ফারুক নির্বাচন কমিশনে কর্মরত স্বজনদের যোগসাজোসে এনআইডি কাণ্ড ঘটিয়েছে। জালিয়াতি চক্রে এ দুজনের পরিবারের সদস্যরা জড়িত।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনির হোসাইন খান জানান, গ্রেফতার হওয়া জয়নাল নির্বাচন কমিশনের লাইসেন্স করা ল্যাপটপটি ব্যবহার করে ওয়েবক্যাম দিয়ে ছবি তোলাসহ জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজই করেছে। জাতীয় তথ্য ভাণ্ডারে এন্ট্রিও দিয়েছে। ওই ল্যাপটপটি ব্যবহার করেই তারা এনআইডি জালিয়াতি করেছে।

একইভাবে গতকাল নগরের হামজারবাগের ভাড়া বাসা থেকে গ্রেফতার হওয়া মোস্তাফা ফারুক হেফাজত থেকে উদ্ধার করা ল্যাপটপটিও নিবাচন কমিশনের। সেটি দিয়ে রোহিংগাদের এনআইডি বানিয়ে দিত মোস্তাফা ফারুক।

জানা গেছে, ২০০৪ সালে জয়নালের মামা তৎকালীন নির্বাচন কমিশন সচিব স ম জাকারিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন অফিসে অফিস সহায়ক (চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী) হিসেবে যোগদান করে। দীর্ঘদিন রাঙামাটি নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে কাজ করার পর ২০১৭ সালে বদলি হয়ে চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে আসেন। এরপরই জাল জালিয়াতির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির কাজ শুরু করে।

জানা গেছে, গ্রেফতার হওয়া মোস্তফা ফারুক বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের অধীন হালনাগাদ কার্যক্রমে টেকনিক্যাল সাপোর্ট স্টাফ হিসেবে কর্মরত। এর আগে সোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে তিনি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, আনোয়ারা, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান ও বোয়ালখালী উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেন।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক রাজেশ বড়ুয়া জানান, জিজ্ঞাসাবাদের মোস্তফা ফারুক এনআইডি জালিয়াতির ঘটনায় সরাসরি জড়িত। তার বাসা থেকে নির্বাচন দুটি রেজিস্টার্ড ল্যাপটপ, একটি মডেম, তিনটি সিগনেচার প্যাড ও জাতীয় পরিচয়পত্র লেমেনিটিং মেশিন জব্দ করা হয়েছে।

সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ফারুকের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ডেল মডেলের ল্যাপটপটি নির্বাচন কমিশনের টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট শনাক্ত করেছেন, যা নির্বাচন কমিশনের ল্যাপটপ। তবে ল্যাপটপের তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। আমরা পেনড্রাইভে পেয়েছি। সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গ্রেফতার মোস্তফা ফারুক চট্টগ্রাম নগরের হামজার বাগ এলাকার ভাড়াটিয়া বাসিন্দা মো. ইলিয়াসের ছেলে। তাদের স্থায়ী বাড়ি ফেনীর দমদমা লস্কর হাটে।

জানা গেছে, গ্রেফতার হওয়া মোস্তফা ফারুক নির্বাচন কমিশনের এক কারিগরি বিশেষজ্ঞের নেতৃত্বে রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাইয়ে দেয়ার কাজ করছিলেন। ফারুক ওই ব্যক্তির চাচাতো ভাই। একই ব্যক্তির আপন ভাই নগরের ডবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসে কর্মরত আছেন। এছাড়া তার এক ভাগ্নী বাঁশখালি উপজেলা নির্বাচন অফিসে কম্পিউটার অপারেটর পদে কর্মরত।

নির্বাচন অফিসের নাম এক কর্মকর্তা জানান, রোহিঙ্গাদের এনআইডি দেয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করে জয়নাল। তার এক মামার মাধ্যমে ২০০৪ সালে নির্বাচন কমিশনে অফিস সহায়ক হিসেবে নিয়োগ পায়। সেই বছরই দেড় কোটি ভুয়া ভোটার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার কারণে জয়নালের মামাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়। কিন্তু নিজের মামা নির্বাচন কমিশনের বড় কর্তা হওয়ায় জয়নালের আচরণ ছিল বেপরোয়া। সর্বশেষ তাকে বান্দরবানের থানচি নির্বাচন অফিসে বদলি করা হলেও তিনি পুনরায় নগরের ডবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসে বদলি হয়ে চলে আসেন।

জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের এনআইডি পাইয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করা জয়নালের অন্তত ১০ স্বজন ঢাকা-চট্টগ্রামসহ নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন দফতরে চাকরি করছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসে অফিস সহায়ক পদে কর্মরত আছেন তার বোনের জামাই নূর মোহাম্মদ। নির্বাচন কমিশনের ঢাকা অফিসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন জয়নালের স্বজন ওসমান গণী চৌধুরী, কক্সবাজার জেলা নির্বাচন অফিসে অফিস সহায়ক পদে কর্মরত রয়েছেন জয়নালেন খালাতো ভাই মোজাফ্ফর। রাঙ্গামাটি জেলা নির্বাচন অফিসে উচ্চমান সহকারী হিসেবে কাজ করছেন জয়নালের আরেক স্বজন মোহাম্মদ আলী। এরমধ্যে কক্সবাজার নির্বাচন অফিসের অফিস সহায়ক মোজাফফর রোহিঙ্গাদের চট্টগ্রামে জয়নালের কাছে পাঠাতেন। চট্টগ্রামে নিয়ে আসতেন জয়নালের আরেক স্বজন জাফর ও আরেক সহযোগী নজিবুল আমিন।

দুদক কর্মকর্তারা জানান, রোহিঙ্গাদের ভোটার করার কাজে জয়নালের স্ত্রী ছাড়াও সৈকত বড়ুয়া, শাহজামাল, পাভেল বড়ুয়া, বয়ান উদ্দিন নামের চার ব্যক্তি সহযোগিতা করতেন। তবে ডাটা ইনপুটের কাজ করতেন নির্বাচন কমিশনের সাবেক দুই কর্মচারী সাগর ও সত্যসুন্দর দে। রোহিঙ্গাদের জন্য প্রতিটি জাতীয় এনআইডি বানাতে জয়নাল ৫০-৬০ হাজার টাকা নিতেন।

জিজ্ঞাসাবাদে জয়নাল জানায়, এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় নিবন্ধনের কাজ করছেন। অফিস সহকারী হলেও নির্বাচন কমিশনের লাইসেন্সধারী ল্যাপটপের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় নিবন্ধনের কাজ শুরু করেন ২০১৮ সাল থেকে। নির্বাচন অফিসের আরও অনেকে এ কাজে জড়িত। ৫০-৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে প্রতিটি রোহিঙ্গাকে ভোটার করা হতো। দালাল আর নির্বাচন অফিসের বিভিন্ন জনকে দেয়ার পর একজন রোহিঙ্গাকে ভোটার করার বিনিময়ে জয়নাল পেতেন সাত হাজার টাকা।

জয়নাল পুলিশকে জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের উচ্চমান সহকারী আবুল খায়ের তাকে এ পথে আনেন। নজিবুল্লা নামে একজন দালাল আবুল খায়েরের মাধ্যমে তার কাছে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসতেন। রোহিঙ্গাদের ভোটার করতে দালাল নজিবুল্লার কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিতেন আবুল খায়ের। তার সঙ্গে যুক্ত আছে কক্সবাজারের আরও অনেকে।

আবুল খায়ের ছাড়াও আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের মোজাম্মেল, মিরসরাই নির্বাচন অফিসের অফিস সহকারী আনোয়ার, পাঁচলাইশ থানা নির্বাচন অফিসের হোসাইন পাটোয়ারি টেকনিক্যাল ও বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের টেকনিক্যাল সাপোর্ট স্টাফ মোস্তফা ফারুক এসব কাজে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে জানায় জয়নাল।

স্বদেশ টুয়েন্টিফোর //এমআর /এবিএম


পোস্ট টি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

স্পন্সরড নিউজ

সম্পাদক:
আসিফ সিরাজ

প্রকাশক:
এইচ এম শাহীন
চট্টগ্রাম অফিসঃ
এম বি কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৯০ হাই লেভেল রোড, ওয়াসা মোড়, চট্টগ্রাম।

যোগাযোগঃ
বার্তা কক্ষঃ ০১৮১৫৫২৩০২৫
মেইলঃ news.shodesh24@gmail.com
বিজ্ঞাপনঃ ০১৭২৪৯৮৮৩৯৯
মেইলঃ ads.shodesh24@gmail.com
কপিরাইট © ২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | স্বদেশ২৪.কম
সেল্ফটেক গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।