মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ০৬:৫০ পূর্বাহ্ন

প্রাণ নেই ‘প্রাণসায়’ খালে

সাতক্ষীরা: আধুনিক সাতক্ষীরার স্থপতি বা রূপকার হিসাবে পরিচিত জমিদার প্রাণনাথ রায চৌধুরী ছিলেন জমিদার বিষ্ণুরাম চক্রবর্তীর (পরে রায়চৌধুরী) পুত্র। নদীয়ার প্রসিদ্ধ জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের ( ১৭১০-১৭৮২বা ১৭৮৩) মৃত্যুর পর তাঁর অধিকৃত জমিদারি পরগনাগুলো নিলামে উঠলে তাঁরই কর্মচারী বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী বড়ুন পরগনা (এখনকার সাতক্ষীরা) কিনে নেন।

১৭৯৭ সালে তিনি সাতঘরিয়া বা সাতক্ষীরা এসে স্থায়ীভবে বসবাস শুরু করেন এবং রায়চৌধুরী উপাধি লাভ করেন। জমিদার প্রাণনাথ সাতক্ষীরায় অনেক জনহিতকর কাজ করেন। তন্মধ্যে প্রাণ সায়ের খাল ও দিঘি খনন, রাস্তাঘাট নির্মাণ , ল্যাম্পপোস্ট স্থাপন , বৃক্ষরোপন অন্যতম। ১৮৬৯ সালে সাতক্ষীরা মিউনিসিপ্যালিটি (বর্তমানে পৌরসভা) স্থাপিত হলে তিনি প্রথম চেয়ারম্যান হিসাবে দীর্ঘদিন (কর্মকাল ১৮৬৯-১৮৯৪)দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরই নামানুসারে সাতক্ষীরাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রাণনাথ (পিএন) হাইস্কুল (১৮৬২) এবং প্রাণনাথ ওয়াটার ওয়াকর্স(১৯১৯)।

সাতক্ষীরা শহরের বুক চিরে প্রবাহিত এক সময়ের প্রমত্তা প্রাণসায়ের এখন ময়লা ফেলার ডাস্টবিন। দখল আর দূষণে প্রাণসায়েরের প্রাণ এখন প্রাণহীন। সরু নর্দমায় পরিণত হয়েছে এ খালটি। শহরের সুলতানপুর বড় বাজার ব্রিজের ওপর রীতিমতো জমে উঠেছে কাঁচাবাজার। খালের বুকে ময়লার ভাগাড়।

একটু দূরেই বরফকল, শৌচাগার। বাণিজ্যিক দোকান, বসত ঘর আর মাছের বাজারও আছে খালের বুক জুড়ে। গড়ের কান্দায় পাড় থেকে খালের বুকে এগিয়ে দখলের দম্ভ ঘোষণা করছে প্রভাবশালীর পাকা দেওয়াল। পাকা পুলের কাছে খালের ওপর ঝুঁকে যেনো জেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের দ্বিতল দালান। বিপরীতে তবু খেয়াজালে জীবনের গান। এদিকটায় কচুরিপানার ছাড়া ছাড়া দল ভাসছে বটে, কিন্তু পানির বর্ণ দূষণে কালোই হয়ে আছে।

অনেক আগেই মজে গেছে প্রাণসায়র। জমিদার প্রাণনাথ রায় চৌধুরীর উদ্যোগে ১৮৬৫ সালে কাটা এই খাল তাই এখন প্রাণহীন। বছরের পর বছর ধরে শহরের বর্জ্য মিশতে থাকায় ঐতিহাসিক এই খাল পরিণত হয়েছে খোলা স্যুয়ারেজ লাইনে। তাই একসময় যে খালের পানি মানুষ পান করতো, সে পানির কাছে আসতে এখন রুমাল চাপা দিতে হয় নাকে।

শহরের মাঝ বরাবর অবস্থানের কারণে শহরবাসীকে নিত্যদিন এই খাল পাড়ি দিতেই হয়। শুনতে হয় প্রাণসায়রের প্রাণ হারানোর আর্তনাদ। কিন্তু সে আর্তনাদও চাপা পড়ে যায় প্রভাবশালীদের খাল দখলের কারণে। শহরের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠার বদলে এই খাল তাই এখন বিষের কাঁটা হয়ে ব্যথা ছড়ায় সাতক্ষীরাবাসির বুকে।

জমিদার প্রাণনাথের খোঁড়া এই খালের সংযোগ দক্ষিণের মরিচ্চাপ নদী থেকে উত্তরের নৌখালি খালের সঙ্গে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪ কিলোমিটার। খননের পর এই খালই হয়ে উঠেছিলো সাতক্ষীরা শহরের যোগাযোগের অন্যতম রুট। মাল আর যাত্রীবাহী বড় বড় নৌযান চলাচলে এক সময় ব্যস্ত থাকতো প্রাণসায়র।
খননকালে এর দৈর্ঘ্য ছিলো প্রায় ১৪ কিলোমিটার। প্রস্থ ছিলো প্রায় ২শ’ ফুট। কিন্তু সেই প্রশস্থতা কমে এখন অনেক স্থানেই ২০ ফুটের নিচে নেমে গেছে। লঞ্চ-নৌকা তো দূরের কথা, ভেলা ভাসানোর মতো অবস্থাতেও নেই প্রাণহীন প্রাণসায়ের।

অথচ একসময় ইছামতির হাড়দাহ দিয়ে কলকাতা খাল হয়ে বড় বড় স্টিমার ঢুকত প্রাণসায়র খালে। এই খাল খননের ফলে সাতক্ষীরার ব্যবসা-বাণিজ্য আর শিক্ষার প্রসার ঘটতে থাকে দ্রুত। এ শহর তাই পরিণত হয় সমৃদ্ধিশালী নগরে। কিন্তু ১৯৬৫ সালের দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে বেশ ক’টি স্লুইস গেট নির্মাণ করা হলে প্রাণসায়রের মৃত্যুযাত্রা শুরু হয়।

স্যুইচ গেট গড়া হয় ইছামতির হাড়তদাহ খাল, কলকাতার খাল, বেতনা নদীর সংযোগ খাল, বালিথা, খেজুরডাঙি নারায়ণজোল ইত্যাদি স্থানে। এরই ধারাবাহিকতায় খোলপেটুয়া নদীর ব্যাংদহা খালের মুখে স্লইসগেট নির্মাণের চেষ্টা শুরু হলে প্রাণসায়রের মরে যাওয়া নিশ্চিত হয়। নদীর স্রোত খালের মধ্যে ঢুকতে না পেরে পলি জমে ভরাট হতে থাকে প্রাণসায়র।

শহরের প্রাণ কেন্দ্র দিয়ে খালের মাধ্যমে যে পানি নিস্কাশন হচ্ছিল তা ব্যাহত হচ্ছে।পানি নিস্কাষন না হওয়ায় পানি জমে দুষণ ঘটাছে। দুরগন্ধ ছড়িয়ে নানা রকম রোগ জীবানুর বিস্তার ঘটাচ্ছে। দ্বিতিয়ত খালের পানি দুষিত হওয়া এই খালে মাছসহ নানা প্রকার জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণির উভয়ের যে সহঅবস্থান হওয়ার কথা ছিল তা হচ্ছে না। এত পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে। এছাড়াও আমাদের অর্থনীতিতে যে ভূমিকা রাখাত সেটিও ব্যাহত হচ্ছে। সৌর্ন্দয্য হানি ঘটাচ্ছে।

প্রাণ সায়ের খাল সাতক্ষীরা শহরবাসির প্রাণ। দখল আর দূষণে খালটি মরমর অবস্থা। প্রাণ সায়েরকে দখলমুক্ত করে এবং অবৈধস্থাপনা উচ্ছেদ করে এর দু’তীরে নান্দনিক পার্ক করতে পারলে শহরের সৌন্দর্য ফিরে আসবে। দূষণ থেকে মুক্তি পাবে শহরবাসি। পানি নিস্কাশনেও খালটি আগের মতো ভূমিকা রাখতে পারবে। শহরবাসির এখন প্রাণের দাবি প্রাণ সায়েরের প্রাণ ফিরিয়ে দেয়ার। সূত্র : উইকিপিডিয়া।

স্বদেশ টুয়েন্টিফোর//প্রতিনিধি/এমএমআর


পোস্ট টি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

স্পন্সরড নিউজ

সম্পাদক:
আসিফ সিরাজ

প্রকাশক:
এইচ এম শাহীন
চট্টগ্রাম অফিসঃ
এম বি কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৯০ হাই লেভেল রোড, ওয়াসা মোড়, চট্টগ্রাম।

যোগাযোগঃ
বার্তা কক্ষঃ ০১৮১৫৫২৩০২৫
মেইলঃ news.shodesh24@gmail.com
বিজ্ঞাপনঃ ০১৭২৪৯৮৮৩৯৯
মেইলঃ ads.shodesh24@gmail.com
কপিরাইট © ২০১৮ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | স্বদেশ২৪.কম
সেল্ফটেক গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।